শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬, ১১:৩৬ অপরাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥
পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমরা আপাতদৃষ্টিতে স্থায়ী মনে করলেও ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা; সময়ের স্রোতে কোনো রাষ্ট্রই চিরস্থায়ী নয়। এক আমলের প্রবল পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্য কিংবা নিকট অতীতের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়ার মতো পরাশক্তির পতন ও ভাঙন এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন, তীব্র জাতিগত বিভাজন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বহু দেশের অস্তিত্বকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের বেশ কিছু দেশ মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে, অথবা তাদের বর্তমান সীমানা হারিয়ে একদম নতুন রূপ ধারণ করতে পারে। এমন চরম ঝুঁকিতে থাকা ১৫টি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মালদ্বীপ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম মালদ্বীপ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অত্যন্ত কম উচ্চতায় অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটির বিস্তীর্ণ এলাকা সাগরের ক্রমবর্ধমান জলস্তরের কারণে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মালদ্বীপ সরকার ইতোমধ্যেই নাগরিকদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে বিদেশে জমি কেনার পরিকল্পনা শুরু করেছে। কোনো রাষ্ট্র যদি জলবায়ু সংকটে সম্পূর্ণ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক আইনে তার সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব কীভাবে বজায় থাকবে- মালদ্বীপ সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে সেই নজিরবিহীন আইনি প্রশ্নের প্রথম বাস্তব উদাহরণ হতে যাচ্ছে।
২. বেলজিয়াম
ইউরোপের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই সমৃদ্ধ দেশটিতে দীর্ঘদিনের গভীর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজন বিদ্যমান। ডাচভাষী ‘ফ্ল্যান্ডার্স’ এবং ফরাসিভাষী ‘ওয়ালোনিয়া’ অঞ্চল দুটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এতটাই মেরুকৃত যে তাদের মধ্যে দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। যদিও রাজধানী ব্রাসেলস দুই অঞ্চলের মধ্যে একটি ভঙ্গুর ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা প্রবল। ফলে ভবিষ্যতে বেলজিয়াম ভেঙে দুটি আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
৩. কিরিবাতি
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত নিচু প্রবাল দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতিও গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চরম শিকার। সমুদ্রের পানির স্তর ক্রমাগত বাড়তে থাকায় দেশটির দ্বীপগুলো শুধু ডুবছেই না, বরং লোনাপানি ঢুকে সুপেয় জলের উৎসগুলোও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এমন আসন্ন মহাবিপর্যয় আঁচ করতে পেরে কিরিবাতি সরকার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ফিজিতে প্রায় ৬ হাজার একর জমি কিনে রেখেছে, যেন চরম সংকটে পুরো জনগোষ্ঠীকে সেখানে সফলভাবে স্থানান্তর করা যায়।
৪. বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
১৯৯৫ সালের ঐতিহাসিক ডেটন চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত বসনিয়ায় একটি অত্যন্ত জটিল ক্ষমতা কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে তিনজন প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত থাকেন। তবে এই রাজনৈতিক মডেল দীর্ঘ মেয়াদে ব্যর্থ হতে চলেছে। সার্ব অধ্যুষিত অঞ্চল ‘রেপুব্লিকা সর্পস্কা’র ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান এবং ক্রোয়াটদের স্বায়ত্তশাসনের জোরালো দাবি দেশটির অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক বড় অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
৫. উত্তর কোরিয়া
কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চরম একাকীত্বের মধ্যেও কিম রাজবংশ উত্তর কোরিয়াকে টিকিয়ে রেখেছে। তবে দেশটির ভেতরের তীব্র খাদ্য সংকট, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং কঠোর সেন্সরশিপ ভেদ করে পশ্চিমা ও দক্ষিণ কোরীয় তথ্যপ্রবাহের বিস্তার পিয়ংইয়ংয়ের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল করছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, কিম প্রশাসনের পতন ঘটলে সেখানে যে চরম ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে, তার জেরে কিংবা দুই কোরিয়ার ঐতিহাসিক পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অবসান ঘটতে পারে।
৬. ইয়েমেন
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ ইয়েমেনকে মানচিত্রের ভেতরেই কার্যত খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলেছে। বর্তমানে দেশটির উত্তর-পশ্চিম অংশ শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে, দক্ষিণে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং অন্যান্য বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর একক প্রভাব। অতীতে দেশটি যেভাবে ‘উত্তর ইয়েমেন’ ও ‘দক্ষিণ ইয়েমেন’ নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি ইয়েমেনকে আবারও সেই স্থায়ী বিভক্তির পথেই ঠেলে দিচ্ছে।
৭. টুভালু
প্রশান্ত মহাসাগরের আরেক ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র টুভালু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দ্রুত বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। জোয়ারের লোনাপানি নিয়মিত লোকালয়ে ঢুকে প্লাবন সৃষ্টি করছে, নষ্ট করছে কৃষিজমি এবং তীব্র করছে সুপেয় পানির সংকট। অস্তিত্বের সংকটে পড়ে বহু নাগরিক ইতোমধ্যেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে যখন দেশের চেয়ে বিদেশে টুভালুর নাগরিক সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে, তখন দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
৮. লিবিয়া
২০১১ সালে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়া আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে পায়নি। দেশটি বর্তমানে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমান্তরাল প্রশাসন দ্বারা বিভক্ত হয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিপুল তেলসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কেবল অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে সেখানে কোনো জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন লিবিয়ার স্থায়ী ভাঙনের আশঙ্কাকে আরও দৃঢ় করছে।
৯. যুক্তরাজ্য (ইউনাইটেড কিংডম)
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া বা ‘ব্রেক্সিট’ দেশটির অভ্যন্তরীণ ঐক্যে বড় ফাটল ধরিয়েছে। ব্রেক্সিটের পর স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার দাবি নতুন করে চাঙ্গা হয়েছে, কারণ বেশিরভাগ স্কটিশ নাগরিক ইইউ-তে থাকার পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জনমিতিক পরিবর্তন ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আগামীতে হয়তো ‘যুক্তরাজ্য’ তার বর্তমান ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক রূপ হারিয়ে ফেলতে পারে।
১০. সোমালিয়া
গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। রাজধানী মোগাদিশুর বাইরে সরকারের কার্যকরী কোনো প্রভাব নেই। বিশেষ করে, ১৯৯১ সাল থেকে ‘সোমালিল্যান্ড’ নামক অঞ্চলটি নিজস্ব প্রশাসন, মুদ্রা ও সেনাবাহিনী নিয়ে কার্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতোই চলছে, যদিও তারা কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না হলে সোমালিয়ার আনুষ্ঠানিক বিভক্তি কেবল সময়ের ব্যাপার।
১১. স্পেন
ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি স্পেনে কাতালোনিয়া ও বাস্ক অঞ্চলের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত পুরোনো। বিশেষ করে ২০১৭ সালের কাতালোনিয়া স্বাধীনতা সংকট বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভেতরেও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কতটা তীব্র রূপ নিতে পারে। কাতালোনিয়ার নিজস্ব শক্তিশালী অর্থনীতি এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাদের স্বাধীনতার দাবিকে এখনো আন্তর্জাতিক মহলে বাঁচিয়ে রেখেছে।
১২. ইরাক
বিংশ শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক শক্তির কৃত্রিমভাবে টেনে দেওয়া সীমানার কারণে ইরাকে জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন কখনোই দূর হয়নি। দেশটির উত্তর অংশের কুর্দিস্তান অঞ্চল বর্তমানে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে এবং তাদের মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন প্রবল। এর পাশাপাশি দেশের মূল রাজনীতিতে শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের গভীর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ইরাকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও অখণ্ডতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে।
১৩. হাইতি
টানা রাজনৈতিক অস্থিরতা, উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দেশজুড়ে সশস্ত্র গ্যাং বা অপরাধী চক্রের নজিরবিহীন সহিংসতার কারণে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতির রাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে দেশটির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের সিংহভাগ এলাকাই গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে। জাতিসংঘের নানা উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সামরিক-বেসামরিক সহায়তা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো টেকসই উন্নতি না হওয়ায় রাষ্ট্র হিসেবে হাইতির টিকে থাকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
১৪. সাইপ্রাস
১৯৭৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। দক্ষিণের অংশটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘রিপাবলিক অব সাইপ্রাস’, অন্যদিকে উত্তরের অংশটি কেবল তুরস্কের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘নর্দার্ন সাইপ্রাস’। গত কয়েক দশক ধরে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহলের নানা আলোচনার পরও এই দুই অংশের পুনরেকত্রীকরণ সম্ভব হয়নি। ফলে বর্তমানের এই অনানুষ্ঠানিক বিভাজনই ভবিষ্যতে স্থায়ী ও আনুষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে।
১৫. মলদোভা
পূর্ব ইউরোপের ছোট ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্র মলদোভা দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও পশ্চিমের টানাপোড়েনের মধ্যে চ্যাপ্টা হয়ে আছে। ১৯৯২ সাল থেকে দেশটির ‘ত্রান্সনিস্ত্রিয়া’ অঞ্চলটি রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ওপর ‘গাগাউজিয়া’ অঞ্চলের রুশপন্থী মনোভাব এবং চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্র প্রভাব মলদোভার ভবিষ্যৎকে আরও বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে মলদোভা হয়তো পুরোপুরি ভেঙে যাবে, না হয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে প্রতিবেশী দেশ রোমানিয়ার সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে পারে।
উপসংহার:
বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র কোনো স্থির ক্যানভাস নয়, বরং তা গতিশীল। বর্তমান শতকের জলবায়ু পরিবর্তন, চরম অর্থনৈতিক সংকট, জাতিগত জাতিবিদ্বেষ এবং পরাশক্তিদের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই নির্ধারণ করবে আগামী ৫০ বছরে কারা টিকে থাকবে। আজকের মানচিত্রে থাকা এসব দেশের কোনোটি হয়তো রূপ বদলে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করবে, কোনোটি অন্য দেশের সাথে মিশে যাবে, আবার কোনোটি হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়।